আমি ইন্টারনেট ফিল্টারিং সেবা বানাই, আর সেই কারণেই কথাটা আমার বলা উচিত: পৃথিবীর সেরা ফিল্টারও আপনার সন্তানকে নিরাপদ রাখতে পারবে না।
এটা বিনয় দেখানোর জন্য বলছি না। ফিল্টার একটা নির্দিষ্ট কাজ করে, এবং ভালোই করে — দুর্ঘটনা ঠেকায়, ঝুঁকি কমায়, আপনাকে সময় কিনে দেয়। কিন্তু সময় কিনে দেওয়ার মানে হলো সেই সময়টা দিয়ে আপনাকে অন্য একটা কাজ করতে হবে। কাজটা কী, সেটা নিয়েই এই লেখা।
আমাদের বাবা-মায়ের চেয়ে কাজটা কঠিন হলো কেন
আমাদের বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা ছিল আমরা বিকেলে কোথায় গেলাম, কার সাথে মিশলাম। সেই জগৎটার একটা সুবিধা ছিল — ওটা চোখে দেখা যেত। কে বাসায় আসছে, কার সাথে ঘুরছে, সন্ধ্যায় ফিরল কি না, সব দৃশ্যমান।
এখনকার বিপদগুলো অদৃশ্য। সন্তান আপনার সামনে সোফায় বসে আছে, একই ঘরে, দুই হাত দূরে — অথচ সে হয়তো এমন কারো সাথে কথা বলছে যাকে আপনি চেনেন না, চিনবেনও না। দূরত্বটা শারীরিক নয় বলে সেটা টেরও পাওয়া যায় না।
তার ওপর সমীকরণটা উল্টো। চিরকাল বাবা-মা জগৎটা সন্তানের চেয়ে বেশি বুঝতেন, আর সেই বোঝার ওপর কর্তৃত্ব দাঁড়াত। এখন প্রযুক্তির ব্যাপারে বেশিরভাগ ঘরে সন্তানই বেশি জানে। কর্তৃত্বের পুরনো ভিতটাই নড়বড়ে।
তাই শুরুতেই নিজেকে একটু ছাড় দিন। "পারফেক্ট ডিজিটাল প্যারেন্ট" বলে কিছু নেই, আর যে বাবা-মা দাবি করেন তাঁরা সবটা সামলে ফেলেছেন, তাঁরা হয় ভাগ্যবান নয়তো এখনো টের পাননি।
ইন্টারনেটকে শত্রু বানালে যা হয়
অনেক পরিবারে ইন্টারনেট একটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়। ফল দুটো, দুটোই খারাপ।
প্রথমত, সন্তানের চোখে আপনি হয়ে যান সেই মানুষ যে সব মজা বন্ধ করে দেয়। এই পরিচয়টা একবার তৈরি হলে আপনার যেকোনো পরামর্শ, এমনকি সঠিক পরামর্শও, আগে থেকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
দ্বিতীয়ত, আর এটাই বড় ক্ষতি — সে নিরাপদে ব্যবহার করতে শেখে না, শুধু লুকাতে শেখে। যে দক্ষতাটা সে আসলে অর্জন করে সেটা হলো আপনার চোখ ফাঁকি দেওয়ার দক্ষতা, আর সেটা সারাজীবন কাজে লাগে।
ইন্টারনেটকে বরং রাস্তার মতো ভাবুন। রাস্তায় দুর্ঘটনা হয় বলে আমরা সন্তানকে ঘরে আটকে রাখি না। ছোট থাকতে হাত ধরে পার করি, একটু বড় হলে পাশে দাঁড়িয়ে দেখি, তারপর একদিন একা ছাড়ি — কিন্তু ছাড়ার আগে শিখিয়ে দিই।
নিয়ম যদি শুধু তার জন্য হয়, নিয়ম টেকে না
বেশিরভাগ পরিবার এখানেই হেরে যায়। "খাবার টেবিলে ফোন নয়" নিয়মটা যদি বাবার অফিসের কলের বেলায় শিথিল হয়, তাহলে সেটা আর নিয়ম নয়, ওটা শাস্তি — আর শাস্তি সবাই ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে।
নিয়ম কম রাখুন, কিন্তু সবার জন্য রাখুন। রাত দশটার পর সবার ফোন বসার ঘরে চার্জে, এই একটা নিয়ম যদি সত্যিই সবাই মানে, সেটা দশটা ভাঙা নিয়মের চেয়ে বেশি কাজ করে। আর আপনি যদি নিজে খাবার টেবিলে scroll করেন, বাকি যা কিছু বলবেন সব বৃথা — বাচ্চারা যুক্তি শোনে না, দৃশ্য দেখে।
জেরা আর প্রশ্নের পার্থক্য
"সারাদিন ফোনে কী করো?" আর "আজ মজার কী দেখলে অনলাইনে?" — দুটো বাক্য প্রায় একই বিষয়ে, কিন্তু প্রথমটায় সন্তান আত্মরক্ষায় চলে যায় আর দ্বিতীয়টায় গল্প শুরু করে।
সপ্তাহে একবার তার পাশে বসে বলুন, "মজার কিছু দেখাও তো।" সে যা দেখাবে সেটা আপনার কাছে অর্থহীন মনে হতে পারে; তবু আগ্রহ নিয়ে দেখুন। এই ছোট অভ্যাসটার আসল উদ্দেশ্য আজকের ভিডিওটা নয়। উদ্দেশ্য হলো তাকে অভ্যস্ত করে তোলা — যাতে তার অনলাইন জীবনের কথা আপনাকে বলাটা স্বাভাবিক হয়ে যায়।
কারণ একদিন সত্যিই খারাপ কিছু ঘটবে। কেউ হুমকি দেবে, কেউ ছবি চাইবে, অস্বস্তিকর কিছু সামনে চলে আসবে। সেদিন প্রথম যার কথা তার মনে পড়া দরকার, সেটা আপনি। আর সেই অভ্যাসটা ওই দিন তৈরি হয় না, তার আগের দুই বছরে তৈরি হয়।
এর উল্টোটাও সত্যি, এবং এটা বেশি নির্মম: যে ছোট গল্পগুলো শোনা হয় না, সেগুলো বলা বন্ধ হয়ে যায়। আর যে সন্তান ছোট গল্প বলা বন্ধ করেছে, সে বড় বিপদের গল্পটাও বলবে না।
ভুলটা হওয়ার পর আপনি কী করেন
সন্তান ভুল করবেই। নিষিদ্ধ সাইটে ঢুকবে, লুকিয়ে গেম খেলবে, এমন কিছু দেখে ফেলবে যা দেখার কথা ছিল না। এটা ব্যর্থতা নয়, এটা প্রত্যাশিত।
যেটা ব্যর্থতা হতে পারে সেটা হলো তার পরের পাঁচ মিনিট। ওই পাঁচ মিনিট ঠিক করে দেয় পরেরবার সে কী করবে। চিৎকার আর শাস্তি একটা জিনিসই শেখায় — ধরা পড়া যাবে না। শান্ত আলোচনা শেখায় অন্য জিনিস — সমস্যা হলে বাসায় বলা যায়।
আগে বুঝুন কী ঘটেছে আর কীভাবে ঘটেছে, তারপর ঠিক করুন এরপর কী। শাসনের জায়গা আছে, অস্বীকার করছি না। কিন্তু সেটা কখনোই প্রথম ধাপ নয়।
তাহলে ফিল্টার কেন
সম্পর্ক যদি এতই গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে আমি ফিল্টার বিক্রি করি কেন — প্রশ্নটা ন্যায্য।
কারণ সম্পর্ক তৈরি হতে বছর লাগে, আর ঝুঁকিটা আজ রাতেই আছে। নয় বছরের একটা শিশুর সাথে খোলামেলা আলোচনা করে পর্নোগ্রাফির ঝুঁকি সামলানো যায় না; ওই বয়সে যেটা দরকার সেটা হলো এমন একটা পরিবেশ যেখানে জিনিসটা ভুল করেও সামনে আসবে না। ফিল্টার সেই পরিবেশটা বানায়, আর সেই ভরসাটুকু পেলে আপনি আসল কাজটা করার সময় পান।
প্রযুক্তিটা সিটবেল্ট। গাড়ি চালানো শেখানোর কাজটা কেউ আপনার হয়ে করে দেবে না।
একটাই অনুরোধ শেষে। ফিল্টার বসান খোলাখুলিভাবে, সন্তানকে জানিয়ে, এবং কারণটা বুঝিয়ে। লুকিয়ে বসানো নজরদারি একদিন ধরা পড়বেই, আর সেদিন যা ভাঙবে সেটা কোনো সেটিংস দিয়ে ঠিক করা যাবে না।
